লক্ষ্মীপুরে অর্থনীতিতে গতি এনেছে নারকেল
‘নারকেল, সুপারি আর ধানে ভরপুর, আমাদের আবাসভূমি প্রিয় লক্ষ্মীপুর’ স্থানীয় কবির কবিতার এ পঙ্ক্তির মতো উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে এ বছর সুপারি, সয়াবিন আর ধানের মতো নারকেলেরও বাম্পার ফলন হয়েছে। কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর রেকর্ড পরিমাণ ফলন হওয়ায় বর্তমানে স্থানীয় বাজারে নারকেল ব্যবসা চলছে জমজমাট। চলতি মৌসুমে জেলায় অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি নারকেলের ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তর। তবে বেসরকারি হিসেবে এর পরিমাণ আরও বেশি। দালালবাজারের নারকেল ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান জানান, প্রতিসপ্তাহে দালালবাজার থেকে ৬০-৭০ লাখ টাকার নারকেল দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব নারকেল যাচ্ছে ভৈরব, খাদেমগঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বাগেরহাট, বান্দরবান, রাঙামাটি, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায়।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার নারকেলের প্রধান মোকাম হচ্ছে সদর উপজেলার দালালবাজার, চন্দ্রগঞ্জবাজার, রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ বাজার, রামগঞ্জ শহর, রামগতির চরআলেকজান্ডার বাজার, বিবিরহাট, রামদয়ালবাজার, কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট, চরলরেঞ্চ ও তোরাবগঞ্জ বাজার। এ খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকায় লক্ষ্মীপুরে নারকেল তেলসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে তোলার জন্য দেশের শিল্প উদ্যোক্তা ও সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নারকেল ও সুপারি চাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জেলায় দুই হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে নারকেল বাগান রয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি নারকেলের ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী যার মূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে ওই পরিমাণ নারকেলের ‘ছোবড়া’ ১০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যে বিক্রি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ এলাকার নারকেল চাষি আনোয়ার হোসেন জানান, প্রায় ১০ একর জমিতে নারকেল বাগান রয়েছে তার। নারকেল চাষে তেমন খরচ নেই। গাছ লাগানোর পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে ফল পাওয়া যায়। একেকটি নারকেল গাছ ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ফল দিয়ে থাকে। প্রতিটি গাছ থেকে প্রতিবছর ২০০-৩০০টি পর্যন্ত নারকেল পাওয়া যায়। এ মৌসুমে ইতোমধ্যে তিনি প্রায় পাঁচ হাজার নারকেল বিক্রি করেছেন। গতবছর ১শ’ নারকেল ১৩শ’ টাকায় বিক্রি করলেও এ বছর তা বিক্রি করেছেন দেড় হাজার থেকে আঠারশ’ টাকায়। চন্দ্রগঞ্জ বাজারের নারকেল ব্যবসায়ী কামাল হোসেন জানান, তিনি এ মৌসুমে এক হাজার নারকেল ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা দামে প্রায় ৫০ লাখ টাকার নারকেল ক্রয় করেছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ লাখ টাকার নারকেল ও ছোবড়া ভৈরব, বাগেরহাট, খাদেমগঞ্জে চালান করেছেন। দালালবাজারের ছোবড়া কারখানার মালিক আকরাম হোসেন জানান, এ শিল্পে কোনো লোকসান নেই। বারো মাস নারকেলের ছোবড়ার চাহিদা রয়েছে। নারকেল শ্রমিক আজগর আলী জানান, বিশ বছর ধরে তিনি নারকেলের ছোবড়া তোলার কাজ করছেন। এক হাজার নারকেলের ছোবড়া তুললে ৩শ’ টাকা পান। দৈনিক তিনি এক-দেড় হাজার নারকেলের ছোবড়া তুলতে পারেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক গোপাল চন্দ্র দাস জানান, জেলায় বছরজুড়ে নারকেল কেনাবেচা হলেও জমজমাট ব্যবসা হয় বর্ষা মৌসুমে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় নারকেলের ভালো ফলন হয়েছে। বাজারে নারকেলের দাম গত বছরের তুলনায় বেশি। চলতি মৌসুমে নারকেলের ব্যবসা খুব জমজমাট। আশা করা হচ্ছে, এ মৌসুমে জেলায় নারকেলের অর্ধকোটি টাকারও বেশি ব্যবসা হবে। আরও পরিচর্যা পেলে জেলায় নারকেলের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাওয়ার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে জেলায় নারকেলভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন জেলার ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ।
-মিজানুর রহমান মানিক